যোগাযোগঃ +৯১ ৯৯০৩৭ ৬৬৩৫৫
ই-মেইলঃ grievance@sonjog.com

পরিবেশ-বিজ্ঞান > বিস্তারিত

উন্মুক্ত মহাকাশ



অগ্নিভ দাস
(Co-founder, Space-e-fic)




আপনার প্রিয় দোকান থেকে পিৎজা অর্ডার দেওয়ার আধঘন্টার মধ্যে সেই পিৎজা আপনার বাড়ি পৌঁছে যাওয়া বা অনলাইনে ক্যাব বুক করে নিৰ্দিষ্ট সময়ে আপনার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাওয়া এখন আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অঙ্গ।

একবিংশ শতাব্দীর এইসব প্রযুক্তি সম্ভবপর হয়েছে মহাশূন্যে থাকা স্যাটেলাইটের জন্য। যারা প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করে চলেছে আমাদের এই পৃথিবীকে।

আমাদের জীবনকে সহজ করে তোলার পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক নবনির্মিত ইন্ডাস্ট্রি, যার নাম 'স্পেস টেকনোলোজি ইন্ডাস্ট্রি'। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরেই আমেরিকা ও সোভিএট্ ইউনিয়ন-এর মধ্যে শুরু হওয়া স্পেস-এ যাওয়ার যে প্রতিযোগিতা, যাকে আমরা 'স্পেস রেস' বলে থাকি, ক্রমশই তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশের নিজস্ব স্পেস প্রোগ্রাম আছে। ৪,৫০০'রও বেশি স্যাটেলাইট প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করে চলেছে আমাদের পৃথিবীকে।

বিগত ১০ বছর ধরে এই ইন্ডাস্ট্রি ধীরে ধীরে দেশীয় সরকারগুলির আওতার বাইরে বেরিয়ে সহজলভ্য হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের জন্য। নিত্যনতুন আইডিয়া এবং প্রযুক্তি নিয়ে সামনে আসছে সদ্য গড়ে ওঠা প্রাইভেট কোম্পানিগুলি।

আজকের দিনে আপনার যদি একটি ভালো আইডিয়া থাকে, তবে আপনিও পেতে পারেন ফান্ড এবং শুরু করতে পারেন আপনার নিজের 'স্পেস টেক কোম্পানি'। Commercialization of space এখন আর কোনো কল্পনা নয়, ঘোরতর বাস্তব।

২০২২ সালে স্পেস টেক শিল্পের বিশ্বব্যাপী মার্কেট-এর আকার প্রায় ২০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। মনে করা হচ্ছে আগামী কুড়ি বছরের মধ্যে এই আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পরিণত হবে, যা এই মুহূর্তে গোটা ভারতবর্ষের বর্তমান জিডিপি-র তিন ভাগের এক ভাগ।

এলন মাস্ক যিনি এই মুহূর্তে বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি, তাঁর বিখ্যাত স্পেস টেক কোম্পানি SPACE-X-এর ব্যাপারে আমরা সবাই কম বেশি অবগত। মাস্কের হাত ধরে ২০০২ সালে যাত্রা শুরু SPACE X-এর। তরুণ মাস্ক-এর স্বপ্ন তখন রকেটকে পুনর্ব্যবহার করা। এর আগে অবধি NASA এবং বিশ্বের বাকি সব স্পেস সংস্থার ব্যবহৃত রকেটগুলি ছিল পুনর্ব্যবহারের অযোগ্য। কিন্তু মাস্ক বুঝেছিলেন যে, রকেটগুলোকে যদি পুনর্ব্যবহার করা যায়, তাহলে স্পেস এ যাওয়ার যে আকাশছোঁয়া খরচ, সেটাকে অনেকটাই কমানো যাবে।

কিন্তু রকেট সায়েন্স যে নেহাৎ ছেলেখেলা নয়। একদল তরুণ সায়েন্টিস্টদের সাথে নিয়ে এই চ্যালেঞ্জকে নিজের প্রতিদিনের অঙ্গ বানিয়ে ফেললেন মাস্ক। দীর্ঘ ৮ বছরের গবেষণা এবং টেস্টিং-এর পর লঞ্চ করলেন প্রথম Falcon 9। কিন্তু নিয়তির কি পরিহাস। ফিরে এলো না মাস্ক-এর সাধের রকেট। ল্যান্ডিং-এর আগেই যান্ত্রিক ত্রূটির কারণে ধ্বংস হয়ে গেলো। মাস্ক কিন্তু হাল ছাড়লেন না, Falcon 9 যে সূচনা করতে পারে রকেট সায়েন্স-এর এক নতুন যুগ-এর। একবার নয়, দু'বার নয়, পরপর তিন বার ডাহা ফেল করলেন। প্রায় সর্বস্বান্ত তিনি, শেষ সমস্ত মূলধন। শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি বিপর্যস্ত।

তবুও শেষ কামড়টা তিনি দিলেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে মূলধন সংগ্রহ করে তিনি Falcon 9-কে ওড়ালেন চতুর্থ বার। এবার কিন্তু তাঁর রকেট আর কোনোরকম গোলযোগ করলো না। বাধ্য ছেলের মতো ল্যান্ড করলো যথাস্থানে। ইতিহাস রচনা করলেন মাস্ক। ইতিহাস রচনা করলো তার কোম্পানি SPACE-X। ফ্যালকন-এর আগে সর্বাধিক বার স্পেস-এ যাওয়া রকেট-এর নাম নাসার 'স্পেস শাটল্‌'। এই রকেট-এর payload cost ছিল ৫০,০০০ ডলার। এর মানে হলো এক কেজির যে কোনো বস্তুকে স্পেস শাটল-এর মাধ্যমে স্পেস-এ পাঠানোর খরচ ছিল এই বিপুল পরিমান অর্থ। Falcon 9-এর ক্ষেত্রে সেই খরচ নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২,৫০০ ডলার। এখানেই আমরা বুঝতে পারি পুনর্ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা। এই মুহূর্তে নাসা তার প্রায় সমস্ত মিশন-এর জন্য Falcon 9 এবং তার উত্তরাধিকারী Falcon heavy ব্যবহার করে।

চমকপ্রদ স্বপ্ন আরেক স্পেস টেক কোম্পানির আরেক কর্ণধার জেফ বেজোস-এর, যিনি বেশ কয়েক বছরের জন্য ছিলেন বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি। অন্যতম e-commerce আমাজনের কর্ণধার জেফ-এর কোম্পানির নাম 'Blue Origin'। স্পেস যাত্রার রোমাঞ্চ তিনি সাধারণের জন্য সহজলভ্য করে তোলায় বিশ্বাসী। সম্প্রতি ২০২১ সালের জুলাই মাসে 'Blue Origin' তাদের প্রথম crewed মিশন সম্পন্ন করে ১০০% সাফল্যের সাথে।

এই মিশন-এর চার জন crew-এর মধ্যে ১ জন স্বয়ং জেফ। এই অভিনব উদ্যোগ আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই জন্ম দেবে এক নতুন ইন্ডাস্ট্রির। যার নাম 'স্পেস ট্যুরিজম'। আগামীতে তাই আপনার প্রিয়জন-এর সাথে ১ কাপ গরম কাপুচ্চিনো খেতে খেতে এই ভীষণ সুন্দর পৃথিবীকে স্পেস থেকে দেখার এবং উপভোগ করার আনন্দ আপনিও পেতে পারেন খুব সহজেই।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে মহাশন্যে নিয়ে যাওয়ার এই অভিনব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই ভারতও। সম্প্রতি এই বছরেরই নভেম্বর মাসে Skyroot Aerospace Pvt. Ltd. ভারতের প্রথম প্রাইভেট সংগঠন হিসেবে স্পেস-এ পাঠালো তাদের নির্মিত রকেট Vikram-S।

ISRO-র প্রথম ডিরেক্টর এবং এই দেশের অন্যতম পদার্থ ও মহাকাশ বিজ্ঞানী Vikram Sarabhai-এর নাম থেকে অনুপ্রাণিত Vikram-S-এর মহাশূন্য যাত্রা প্রতিষ্ঠা করলো এদেশ-এর রকেট সায়েন্স-এর এক নতুন যুগ। কেন্দ্রীয় সরকার-এর আওতা থেকে বেরিয়ে স্পেস commercialization-এর এই নতুন অধ্যায় Skyroot-এর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখলো ইতিহাসের পাতায়। নিকট ভবিষ্যতে 3D প্রিন্টিং-এর মাধ্যমে মাত্র ২ দিনে একটি সমগ্র রকেট বানানোর পরিকল্পনা এই প্রাইভেট সংস্থার।

Skyroot ছাড়াও বিগত ৫ বছরে এই দেশের বুকে জন্ম নিয়েছে ১০০-রও বেশি প্রাইভেট স্পেস টেক সংস্থা। এর মধ্যে Dhruva Space, Agnikul Cosmos, Bellatrix Aerospace, Pixxel-এর মতো সংস্থাগুলি উল্লেখের দাবি রাখে।

আগামীতে ISRO-র পাশাপাশি এই সংস্থাগুলির হাত ধরে এদেশের স্পেস ইকোনমি যে নতুন দিশা পাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান-এর বিপুল সুযোগ করে দেবে নবনির্মিত এই উদ্যোগগুলি।


(বক্তব্য লেখকের নিজস্ব। - সম্পাদকমণ্ডলী, সংযোগ)