যোগাযোগঃ +৯১ ৯৯০৩৭ ৬৬৩৫৫
ই-মেইলঃ grievance@sonjog.com

পরিবেশ-বিজ্ঞান > বিস্তারিত

রূপমারির নোনা মাটিতে ফিরছে দেশি ধান
উদ্যোগ বিজ্ঞান মঞ্চের





সংযোগ প্রতিবেদনঃ "এখানে জলের খুব সমস্যা। নলগুলো খারাপ, জল আসেনা। মাঝেমধ্যেই খাওয়ার জন্য জল কিনতে হয়।"

"টিউবওয়েলের জল পাওয়া যায় না?"

হাসনাবাদ স্টেশনের এক কোণে চায়ের দোকান থেকে জবাব এলো, "পাওয়া কেন যাবে না! তবে সে জল খেতে পারবেন না, জল নোনা।"

সুন্দরবনে নদীর জলে নুন, মাটির নিচের জলও নোনা, বিস্বাদ। ছয় থেকে সাতশো ফুট নিচে পাইপ না নামালে পানীয় জল মেলে না। চাষের জমিতে ঢুকছে নোনা জল। মার খাচ্ছে ধান চাষ। নদীর জলে নুনের মাত্রা বেশি। বাঁচার রাস্তা খুঁজতে শুরু হয়েছে নোনা জমিতে গজাতে পারে এমন চিরাচরিত প্রজাতির ধান চাষ। উদ্যোগ নিয়েছে 'পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ'।

দেশি বীজ, নোনা মাটি

"অটোতে যাচ্ছেন এখন, সাইক্লোনের পর এই রাস্তাটায় বুকের ওপর জল ছিল।" অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং বিজ্ঞানকর্মী পার্থ মুখার্জি বললেন অবস্থা বোঝাতে। অটো তখন রূপমারীর রাস্তায়। আর কিছুদূরেই কুমিরমারী। হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভার মধ্যে কেবল এই অঞ্চল নয়, নোনা জলের দাপট গোটা সুন্দরবনের ১৯টি ব্লকেই।

রূপমারীতে কয়েক জায়গায় শুরু হয়েছে দাদসাল, ঘেওস, খেজুরছড়ি, তালমুগুরের মতো দেশি প্রজাতির ধান চাষ।

দেবদাস মণ্ডলের বাস এবং চাষ হলদা স্কুলের কাছেই। কাদামাটিতে পেতে রাখা গাছের গুঁড়ি পেরিয়ে নিজেই নিয়ে গেলেন সবুজ মাঠে। জানালেন, "১৬ কাঠায় তালমুগুরের বীজ ফেলেছিলাম শ্রাবণে। গাছ গজিয়েছে।" বছর চল্লিশের স্নাতক স্তর পেরোনো কৃষক দেবদাস বলছেন, "জৈব সার দিয়েছি, গোবর থেকে তৈরি। পৌষের ১০ থেকে ১৫ তারিখ কাটা হবে। ৭ বস্তা ধান হবে অন্তত।"

প্রতি বস্তা মানে ৬০ কেজি। দেশি ধান বাজারে বিকোয় বস্তায় ১,৬৫০ টাকা দরে। 'পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ'-র ইছামতী কেন্দ্র প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। যোগাযোগ রাখে কৃষকদের সঙ্গে।

বিজ্ঞান মঞ্চের এই সাংগঠনিক কেন্দ্রেরই সভাপতি পার্থ মুখার্জি, স্থানীয়দের কারও 'স্যার', কারও 'মাস্টারমশায়'। তিনি জানালেন, "বিজ্ঞান মঞ্চই বিনে পয়সায় বীজ দিয়েছে কৃষকদের। দেশি ধানের বিজ্ঞান এবং অর্থনীতি বলেছে।"

বাজারে নানা কোম্পানির বীজ ছেড়ে দেশি ধান কেন? দেবদাস বললেন, "কোম্পানির বীজ রাখা যায় না, চাষ করে ফেলতেই হবে। হাইব্রিড বীজে জমির আয়ু কমছে। দাদসালের বীজ পরের বছরের জন্য রাখতে পারব।"

চাষের জমি থেকে আগাছা সরানোর কাজকে এখানে স্থানীয়রা বলেন 'খোয়ালি'। কৃষকরা বলেছেন, হাইব্রিড চাষে খোয়ালির কাজ বেশি থাকে।

নোনা জল চাষের জমিতে!

সাইক্লোনে নোনা জল বাঁধ ভেঙে ঢুকে পড়ছে চাষের জমিতে। বহু জায়গায় ধান চাষ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত কিছু লাভের আশায় জমিতে জল ঢুকিয়ে চিংড়ির চাষ হচ্ছে।

বিজ্ঞান মঞ্চের রূপমারির 'ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর চক্র'র সভাপতি শক্তিসাধন দাস। প্রাকৃতিক বিপর্যয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিভাবে স্থায়ী প্রভাব ফেলছে ব্যাখ্যা করছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, "২০২০ আর ২০২১-এর মে-তে পরপর দু'বার হলো সাইক্লোন, আমফান এবং ইয়াস। চাষের জমিতে হু-হু করে ঢুকলো নোনা জল। ফলতঃ তিন বছর আর ধান চাষ করা যাবে না। অনেকে বাধ্য হয়ে চিংড়ির চাষে ঝুঁকলেন। কিন্তু চিংড়িও প্রথম দিকে আয় দেয়, পরে আয় কমতে থাকে। এটা বিকল্প নয়। নোনা জমিতে ধান চাষের ভাবনা এল তখন থেকে।"

সে সময় টানা প্রায় ত্রিশ দিন যৌথ রান্নাঘর চালিয়েছিল বিজ্ঞান মঞ্চ, জানালেন পার্থ মুখার্জি। আর শক্তিসাধনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রতিবেশীদের অনেকেই। উঁচু নদীবাঁধের দাবি এখানে ঘরে ঘরে।

হাসনাবাদ-হিঙ্গলগঞ্জের সড়ক মসৃণ। সে রাস্তার ওপর বরুণহাট লঞ্চঘাট থেকে ভেতরে কুমিরমারির পথে রূপমারি প্রায় বারো কিলোমিটার রাস্তা। জায়গায় জায়গায় রাস্তা বলে কিছু নেই, খোলা ইট বেরিয়ে রয়েছে। স্কুলের পথে ছাত্র-ছাত্রীরা যাচ্ছে এই রাস্তা দিয়েই। ছোট ছোট মুদি দোকানে বোতলে ভরে বিক্রি হচ্ছে জ্বালানি তেল। খালের গায়ে বাঁধের ধার ঘেঁষে প্লাস্টিকে ছাওয়া চালাঘর দেখা যাচ্ছে চারদিকে।

গ্রামের ভেতরে অভাবের ছাপ স্পষ্ট। পর পর গ্রামে অনেকেই বলেছেন বাইরে অনেকে কাজ করতে গিয়েছে বলে তবু চলছে কোনোমতে।

কৃষক যখন বিজ্ঞানকর্মীও

কুশকুমার সর্দার ৫ কাঠায় ঘিওস চাষ করেছেন। সারি সারি মাটির বাড়ির মাঝ দিয়ে নিয়ে গেলেন মাঠে। কুশকুমার বলছেন, "আমি বিজ্ঞানকর্মীও। দেশি প্রজাতির ধান নোনা জমিতে ফলতে পারে। আমি ঘিওসের বীজ ফেলেছি। হাইব্রিডের চেয়ে ফলন কিছুটা কম। কিন্তু খরচ আরও অনেকটা কম।"

এ বছর বর্ষার জল বিশেষ মেলেনি। চাষ যদিও বৃষ্টির জলের ভরসাতেই হয় মুখ্যত। বেশিরভাগ জমিই একফসলি। চারা থেকে পাশে গজানো চারাগাছকে বলেন 'পাশকাঠি'। কুশকুমার জানাচ্ছেন যে পাশকাঠি বেশি হাইব্রিডের তুলনায়। ১৬ বিঘে মোট চাষ তাঁর। বলছেন, "বীজ রেখে পরের বছর ঘেওসের জমি আরও বাড়াবো।"

উত্তর রূপমারির টিনপাড়ায় দেশি বীজে আড়াই বিঘে চাষ দিয়েছেন প্রবীণ কৃষক সন্ন্যাসী সরদারও। তাঁর হিসেব, "হাইব্রিডের চেয়ে ফলন দু'বস্তা কম হবে। পুষিয়ে গেছে খরচে।" এই চাল তুলবেন নিজের জন্য। বাকি জমিতে চাষ হচ্ছে দোকানের বীজে। বিক্রি করবেন সেই ধান। তিনি এই নিয়ে দু'বার দেশি ধান চাষ করছেন।

"আগেরবারের বীজ রাখেননি?" জিভ কেটে সন্ন্যাসী বললেন, "পুরোটাই জমিতে দিয়েছি।" বীজ খানিক নিয়ে অন্যদের দেওয়ার পরিকল্পনা বিজ্ঞান মঞ্চের। পাশেই ছিলেন টগবগে তরুণ শোভন প্রামাণিক। মাস্টারমশায়কে হেসে বললেন, "এবার রাখব। আর ভুল হবে না স্যার।"