হাইড্রোজেন যখন 'সবুজ'
সংযোগ প্রতিবেদনঃ হাইড্রোজেন কি রং পাল্টায় হাইড্রোজেন কি ধূসর হয়, নীল হয় আবার সবুজও হয়?
আমাদের সবসময় প্রয়োজন জলের পরমাণুতেই থাকে হাইড্রোজেন। আমরা সকলেই জানি আসলে হাইড্রোজেন সবুজ কিনা তা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে বিকল্প শক্তির খোঁজ।
দেশের সরকার ঘোষণা করেছে 'গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন'। ভর্তুকির জন্য বাজেটে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় কুড়ি হাজার কোটি টাকা।
'গ্রিন হাইড্রোজেন' কী?
'গ্রিন হাইড্রোজেন', মানে যেই জ্বালানি ব্যবহার করলে বাতাসে কার্বন মিশবে না। পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। দেশের সরকারের নীতি হলো ভর্তুকি নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এই জ্বালানি তৈরি করবে। এদেশে আম্বানি বা আদানি মতো গোষ্ঠী বিজ্ঞাপন দিয়ে এই প্রকল্পে বিনিয়োগের ঘোষণা করেও রেখেছে।
বস্তুত সারা বিশ্বে বিকল্প জ্বালানির খোঁজ যে যে প্রযুক্তির হাত ধরে করা হচ্ছে তার একটি 'গ্রিন হাইড্রোজেন'। হাইড্রোজেন প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে তৈরি করলে বাতাসে কার্বন মিশবে। যে প্রযুক্তিতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে সবচেয়ে বেশি মিশবে পরিভাষায় তাকে বলা হয় 'ধূসর হাইড্রোজেন'। উৎপাদনের সময় নির্গত কার্বনকে যদি কোনোভাবে আটকে রাখা যায় বাতাসে মেশা থেকে তাহলে সেই পদ্ধতিতে তৈরি হাইড্রোজেনকে বলা হবে 'ব্লু হাইড্রোজেন'।
'গ্রিন হাইড্রোজেন প্রযুক্তি' ন্যাচারাল গ্যাস বা খনি থেকে তুলে আনা গ্যাস ব্যবহারই করবে না। জল থেকে তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি করবে হাইড্রোজেন। কার্বন বাতাসে মেশার ঝুঁকি একেবারেই কমিয়ে দেবে। তাই সবুজ বা গ্রিন হাইড্রোজেন।
ভারতের লক্ষ্য কী?
নীতি আয়োগ একাধিক পরিকল্পনা জানিয়েছে। আর দেশের শক্তি মন্ত্রক একাধিক লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।
নীতি আয়োগ বলছে বছরে প্রায় একশো ষাট বিলিয়ন ডলার দেশের কোষাগার থেকে বেরিয়ে যায় বিদেশ থেকে পেট্রোলিয়াম আমদানিতে। পরের ১৫ বছরে এই খরচ দ্বিগুণ হবে। বিকল্প শক্তি উৎপাদন বাড়লে এই খরচ তো বাঁচবেই কারণ পেট্রোলিয়াম আমদানি করতে হবে না, তার ওপর দেশের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতাও বাড়বে। সেই সঙ্গে ৩.৬ গিগাটন কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে কম মিশবে। ঠিকভাবে এগোতে পারলে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারত পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি ব্যবহারে এভাবেই এগোতে পারে।
দেশের শক্তি মন্ত্রক লক্ষ্য আরো নির্দিষ্ট করছে। বলা হচ্ছে, বছরে এক লক্ষ কোটি টাকা আমদানি সঞ্চয় তো হবেই তার ওপর ৬০ থেকে ১০০ গিগাওয়াট ইলেক্ট্রোলাইজার উৎপাদনের ক্ষমতাও দেশে তৈরি হবে। এই ইলেক্ট্রোলাইজার ব্যবহার করেই জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ করে হাইড্রোজেন পাওয়া সম্ভব।
শক্তি মন্ত্রক আরো বলছে, বছরে ১২৫ গিগাওয়াট বিকল্প শক্তি তৈরি করা সম্ভব ২০৩০ সালের মধ্যে।
সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০'র মধ্যে ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন। নীতি আয়োগ জানাচ্ছে, এখন ভারতে এই পরিমানে হাইড্রোজেন ব্যবহার করা হয়। পেট্রোলিয়াম শোধনাগার এবং অ্যামোনিয়া তৈরিতে তা ব্যবহার করা হয়। তবে এই উৎপাদন পরিবেশ বান্ধব নয়।
বিকল্প শক্তি ব্যবহারে একটি সমস্যা হলো ভারী কাজের জন্য প্রায়শই প্রযুক্তি সহায়তা করে না। যেমন ইলেকট্রিক যানের জন্য ব্যাটারি বারবার রিচার্জ করতে হয়। ১ কেজি ব্যাটারির সেল থেকে যতটা বিদ্যুৎ মেলে তার ৩২ গুণ দেয় ১ লিটার পেট্রোল। গ্রিন হাইড্রোজেন সেই সমস্যা মেটাতে পারে। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল অনেক বেশি সময় ধরে শক্তি জোগাতে পারে। নীতি আয়োগ আরও বলছে, অ্যামোনিয়া তৈরি এবং পণ্যবাহী ভারী যানের জন্য গোড়ায় ব্যবহার হবে এই বিকল্প জ্বালানি।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আনবে 'গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন'। বছরে অন্তত ছ'লক্ষ নতুন কাজ তৈরি হবে এই প্রকল্পে। বিনিয়োগ হবে ৮ লক্ষ কোটি টাকা। যেটা বলা হচ্ছে না, এই বিনিয়োগের দায়ভার মুখ্যত বেসরকারি বড় একচেটিয়া কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতেই ছাড়া রয়েছে।
যার অর্থ উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম ঠিক করবে এই বেসরকারি কর্পোরেটরাই। বিশ্বজুড়েই বিকল্প শক্তির দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। পেট্রোলের দাম এদেশে, টাকার সঙ্গে ডলারের বিনিময় মূল্যে, লিটারে এক ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু গ্রিন হাইড্রোজেন এক কেজি তৈরি করতে হলে খরচ পড়ে যাচ্ছে তিন ডলারের কাছাকাছি। প্রযুক্তিবিদরা জানিয়েছেন বিকল্প শক্তির খরচ কমছে। কারণ প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে কম খরচে তৈরির বন্দোবস্ত হয়ে যাচ্ছে।
সমস্যা কোথায়?
ভারতে আরেকটি দিক হলো জল। ১ কেজি পুনর্নবীকরণ যোগ্য হাইড্রোজেন তৈরিতে দরকার ১০ লিটার জল।
'ফ্লোরেন্স স্কুল অব রেগুলেশন'-এর ওয়েবসাইট (fsr.eui.eu) ভারতে গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনের সম্ভাবনায় আশাবাদী হয়েও একটি প্রশ্ন তুলেছে। ২০২২'র মধ্যে দেশে বিকল্প শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য যা ছিল তা হয়নি। বস্তুত লক্ষের ৩২ শতাংশ বা প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ কম উৎপাদন হয়েছে। এই হিসেবে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদন বাদ রাখা হয়েছে।
প্রশ্নটা এখানেই, এই পিপিপি বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল আদৌ কতটা দক্ষ?
সূত্রঃ
১. Niti Aayog, 'Harnessing Green Hydrogen'.
২. Ministry of Power GoI, 'Green Hydrogen Policy', Policy Document.
৩. D. Dubey, 'Did India really achieve its goal of 175 gigawatt of renewable energy by 2022?', Scroll India.
৪. www.fsr.eui.eu
৫. Green Energy Plan for Indian Capital but not for its People: Prabir Purkayastha, Peoples Democracy.