যোগাযোগঃ +৯১ ৯৯০৩৭ ৬৬৩৫৫
ই-মেইলঃ grievance@sonjog.com

চারদিক > বিস্তারিত

মানভূম, বরাকের পথ ধরে



দ্বৈপায়ন




মানুষ আর পশুর মধ্যে বড় যা পার্থক্য তা হলো ভাষা আর চিন্তা করার স্বাধীনতা থাকা না থাকার।

যদি মানুষের কাছ থেকে ভাষা ও চিন্তা করার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয় তখন মানুষ পশুবৎ হয়ে ওঠে। তখন মানুষ আর পশুতে কোনো পার্থক্য থাকে না। ভাষার অধিকার রক্ষা আর চিন্তা করার স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্য মানুষ বারবার লড়াই করেছে। যখনই শাসক ভাষা আর ভাবনাচিন্তার স্বাধীনতার উপর আক্রমণ হেনেছে, তখনই নাগরিকরা আন্দোলন করেছে, পথে নেমেছে। খোঁয়াড়ের বিজলি বাতির আলোর জৌলুস সেই আন্দোলনকে ম্লান করে দিতে পারেনি।

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখব ক্ষমতা হস্তান্তরের বহু আগে, হিন্দি ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে ১৯১২ সাল থেকে মানভূমে 'বাংলা ভাষা আন্দোলন' শুরু হয়, ১৯৪৮-১৯৫৬ তা ব্যাপক হয়ে ওঠে, ১৯৫৪ সালে ৯ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি 'টুসু সত্যাগ্রহ আন্দোলন' চলে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। হাজার হাজার বাংলাভাষী নাগরিক সেদিন কারাবরণ করে। মানভূমের ভাষা আন্দোলনকে পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলনের আখ্যা দেওয়া হয়। আমরা ভুলতে পারি না ভাষা সৈনিক ভাবিনি মাহাতো-র কথা।

আসামের বরাক উপত্যকায় অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র প্রশাসনিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরুদ্ধে সেখানে আন্দোলন সংগঠিত করে আসামের বাংলাভাষী নাগরিকরা। ১৯৬১'র ১৯ মে এগারো জন ভাষা সৈনিককে নির্বিচারে হত্যা করে শিলচর প্রাদেশিক পুলিশ।

বর্তমান বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে ১৯৫২ সালে উর্দু ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিবাদে ও বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হয়।

সে সময়ে সেখানে ৫৪ শতাংশ নাগরিক ছিলেন বাংলাভাষী। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর পুলিশের লাঠি ও গুলি চালানোর মত বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে। নিহত হয় রফিক, জব্বার সহ আট জন আন্দোলনকারী। পরবর্তীতে ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটাকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'-এর স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ভাষার প্রতি শাসকের আগ্রাসন আজও চলছে বহাল তবিয়তেই।

ভারতের বর্তমান কেন্দ্র সরকার যে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান-এর নীতি নিয়েছে, তা আসলে একটি ভাষাকে অন্য একটি ভাষার উপর চাপিয়ে দেওয়া ছাড়া কিছু নয়। বাংলার বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তক এমনকি এখানকার আঞ্চলিক গ্রাহক পরিষেবা কেন্দ্রগুলিতেও শাসকের ভাষা-আগ্রাসন পরিলক্ষিত।

আর প্রতিবাদটা সেখানেই, ভাষার অধিকার, ভাব প্রকাশের যে সংবিধান স্বীকৃত অধিকার তাকে পিষে দিয়ে বর্তমান শাসক বারে বারে যা করতে চাইছে তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ভাষার অধিকার বেঁচে থাক। সব জায়গায় সব ভাষার অধিকার সুরক্ষিত থাক, অতীতের ঈশ্বরের প্রতিনিধি রাজা আর আজকের নাগরিকের ঈশ্বর নেতা, এ ধারণা বদ্ধমূল থাকলে নাগরিক তার অধিকার অবশ্যই বুঝে নেবে।