যোগাযোগঃ +৯১ ৯৯০৩৭ ৬৬৩৫৫
ই-মেইলঃ grievance@sonjog.com

চারদিক > বিস্তারিত

ঢাক এল কোথা থেকে?



পারমিতা রায়




ঢ্যাম কুড়াকুড়, ঢ্যাম কুড়াকুড়... শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘ, কাশবন, শিউলির গন্ধ, ঢাকের বাদন... বাঙালির মননে উৎসবের আমেজ বোনে। শারদোৎসবের ঐতিহ্যের অঙ্গ ঢাক।

কবে থেকে কে জানে! উৎসব শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয় ঢাকিদের আনাগোনা। ঢাক ছাড়া শারদোৎসব পূর্ণতা পায় না। কিন্তু এই ঢাক বা ড্রাম এল কোথা থেকে? গবেষণা বলে, সভ্যতার আদিপর্ব থেকেই।

যাবতীয় বাদ্যযন্ত্রের উৎপত্তি আমাদের জীবন থেকে। আমাদের চলার গতিতে আছে ছন্দ। দুই পা সমান ছন্দে, সমান লয়ে গতিময় হয়। আদিম মানুষ শিকার করে মৃত পশুর চামড়া পরিধান করল। উদ্বৃত্ত শুকনো চামড়া দিয়ে কোনো একদিন কোনো এক খেয়ালে ফাঁপা নলের মতো কাঠের টুকরোর একধারে ঢেকে দিল। তার ওপর আঘাত করে নিজেই অবাক হয়ে গেল। চলার ছন্দে আঘাত করে সৃষ্টি হল তাল। তাল আর ছন্দ মিলে গিয়ে হল আনন্দের প্রকাশ। শব্দের এতো উঁচুস্বর, এতো গাম্ভীর্য যে পশু তাড়ানোর কাজে একে ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না আদিম মানুষ। পরে যখন গ্রাম গড়ে উঠল তখন ঢাক হয়ে উঠল গ্রাম থেকে গ্রামে সংবাদ বা সংকেত পাঠানোর মাধ্যম। ড্রাম বা ঢাকের এক একরকম শব্দ এক একটি সংকেত। তাই অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার প্রত্যন্ত জঙ্গলে, গ্রামে আদিম জনজাতি, উপজাতিদের আদিম বাদ্যযন্ত্র ঢাক বা ড্রাম। তবে উপজাতি ও এলাকাভেদে ড্রামের আকৃতি, গঠন ও শব্দ আলাদা।

বাংলার চন্দ্রকেতুগড় অঞ্চলে পাওয়া একটি ফলকে চার অনুচর-সহ দশায়ুধা মাতৃকার সামনে হাঁড়িকাঠে পাঁঠাবলি হচ্ছে দেখা যায়, সেই সঙ্গে ঢাক বাজছে।

মধ্যযুগে ঢাক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হত। নাচ, গান, নাটকে অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে ঢাকের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায় মঙ্গলকাব্যগুলোতে। পুজোতে ঢাক বাজানোর প্রচলন ছিল। রাজার লোক গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঢাক বাজিয়ে লোক জড়ো করে রাজার আদেশ বা নির্দেশ গ্রামের লোকেদের কাছে পৌঁছে দিত। কিন্তু তখনও ঢাকি সম্প্রদায়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ শাসনের সময় থেকে দুর্গাপুজো উৎসবের রূপ নিতে শুরু করে। ব্রিটিশ সরকারের নজরে আসার জন্য স্থানীয় রাজা ও জমিদারদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তার ফলে নিজেদের প্রতিপত্তি দেখানোর অন্যতম মাধ্যম হল দুর্গাপুজো। এ সময়েই ঢাকিদের কথা পাওয়া যায়। রথযাত্রার দিন প্রতিমার কাঠামো বাঁধা হয়। ঢাক বাজানো শুরু সেখান থেকেই। প্রতিমার আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা, পুজো, ধুনুচিসহ আরতি, বিসর্জনের বাজনা বা ঢাকের বোল আলাদা। ঢাক প্রথমে ধীর লয়ে বাজানো হয়। ক্রমে লয় দ্রুত হয়।

বাংলা ঢাক বানানো হয় সাধারণত আমগাছ থেকে। কান্ডের মাঝখানটা ফাঁকা করে দু'দিকে ছাগলের শুকনো চামড়া দিয়ে দু'ধার আচ্ছাদিত করে। একধার থেকে অপর ধার পর্যন্ত ঢাকটিকে ঘিরে থাকে সরু সরু মোষের চামড়ার ফিতে কিছুটা ফাঁক রেখে রেখে। ঢাকের কেবলমাত্র ডানদিকই বাজানো হয়। তার শব্দের কম্পনে অপর দিকে কম্পন তৈরি হয়। সৃষ্টি হয় ধ্বনি। ঢাক বাজানো হয় সরু বাঁশের লাঠি দিয়ে। আবার স্থানভেদে ঢাকের আকার ও আকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন আসামের ঢাক লম্বাটে। ঢাক বাজানোর পদ্ধতিও এক এক জায়গায় একেকরকম। কোথাও হাত দিয়ে, কোথাও কাঠি দিয়ে, কোথাও বা একদিকে হাত অপরদিকে কাঠি দিয়ে বাজানো হয়।

আবার বাংলার ঢাকেরও রকমফের আছে। ঢাক, জয়ঢাক, বীরঢাক ইত্যাদি। আওয়াজ ও আকৃতির তারতম্য অনুসারে এই নামকরণ হয়ে থাকে। বাংলার সমাজজীবনের নানারকম সংস্কার, ধর্ম ও রীতিনীতির সঙ্গে ঢাকের বাজনা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তার মধ্যে দুর্গাপুজো এবং চৈত্র সংক্রান্তিতে গাজনের সময়ে ঢাকের বাজনা অপরিহার্য।

ঢাক হল অনেক রকম তালবাদ্যের উৎস। ভারতে ঢাক থেকে সৃষ্ট মাদল, মৃদঙ্গ, ঢোল, খোল, ঢাক্কা ইত্যাদি সহ প্রায় ৪২ রকমের তালবাদ্য প্রচলিত আছে। যদি সব প্রদেশের ঢাক ও ঢাক থেকে তৈরি বাদ্যযন্ত্রগুলোকে একসাথে সাজানো যায় তবে চোখে পড়বে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য।

নবপত্রিকা আরাধনা করে শুরু হয় দুর্গাপুজো যা একাধারে ফসলের উৎসব, মাটির ঊর্বরা শক্তি বৃদ্ধির উৎসব। আর সেই ফসল রক্ষার্থেই ঢাক বা ড্রাম বাজিয়ে তাড়ানো হত পশু। তাই হয়তো দুর্গাপুজো ঢাকের বোল ছাড়া সম্ভব নয়।