আদানিকান্ড
চিত্র মিত্র
গত ২৪ জানুয়ারি, ২০২৩ আমেরিকার 'শর্টলিস্ট' সংস্থা হিন্ডেনবার্গ ভারতজাত শিল্পপতি গৌতম আদানির বিরুদ্ধে ধোঁকা দিয়ে নিজেদের গ্ৰুপের কোম্পানীগুলোর স্বাস্থ্য ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখিয়ে বাজার থেকে সুবিধা আদায় করে নেবার অভিযোগ করে তাদের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে। আর এই রিপোর্ট বেরোবার পর থেকেই সদ্য পাওয়া বিশ্বের তৃতীয় ধনীতম ব্যক্তির আসনটি আদানিবাবু হারিয়ে প্রতিদিন তলিয়ে যেতে থাকলেন। গৌতম আদানির সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বন্ধুত্ব ও দুজনেরই একইসঙ্গে রকেট গতিতে উত্থানের গল্প সবাই জানেন। তাই একটা টানটান উত্তেজনা ছিল এবং আছে এটা দেখার জন্য যে নিজেদের জগতে 'ভেল্কি' দেখাবার মতন 'অতিমানবিক ক্ষমতার অধিকারী' এই দুই ব্যক্তি এবার কি ভেল্কি দেখাবেন!
কংগ্ৰেস সহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি প্রশ্ন তুলেছেন আমাদের দেশে 'সেবি'র মতন যে নিয়ামক সংস্থাগুলি আছে তারা কেন এই ধোঁকা ধরতে পারলো না এবং এঁরা ও সরকার এইরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের মতামত ও পর্যবেক্ষণ দেশবাসী ও দুনিয়ার কাছে তুলে ধরছেন না কেন? কেননা এই তদন্ত রিপোর্ট আমাদের দেশের নিয়ামক সংস্থাগুলির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। সরকারেরও। সংসদে বাজেট অধিবেশন উত্তাল হল প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি এবং দ্রুত তদন্তের দাবিতে। কিছুদিন পরে অর্থমন্ত্রী জানান – সব ঠিক আছে, আমাদের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি পরিস্থিতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। এবং শেয়ার বাজারে আদানিদের রক্তক্ষরণ হলেও সামগ্ৰিকভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েনি - এই তথ্য তুলে ধরে 'সব চাঙ্গা সি' সুলভ বরাভয় দিয়েছেন।
আদানির শেয়ারের পতনের ফলে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা স্রেফ হাওয়ায় উবে গেছে। ইনভেস্টারদের টাকা - পাবলিকের টাকা। আদানিদের সংস্থায় ঢুকে আছে এলআইসি, স্টেট ব্যাঙ্ক, ব্যাঙ্ক অব বরোদা, ব্যাঙ্ক অব জম্মু-কাশ্মীরের মতন রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের টাকা - পাবলিকের টাকা। এইসব টাকা উবে যাওয়ায় আদানি বড়লোকের র্যাঙ্কে তলিয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু এর থেকেও বড় দুশ্চিন্তার কারন হয়ে উঠতে পারে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থার দ্বারা আদানিদের বন্ডের ভ্যালুয়েশন কমিয়ে দেওয়া ও আদানিদের কোম্পানীগুলিকে 'অ-নিরাপদ' বলে দেগে দেবার মতন ঘটনাগুলি। এর ফলে বাজার থেকে বিনিয়োগ ও ঋণ পাওয়াটা কঠিন হয়ে যেতে পারে। অথচ এটাই ছিল আদানিদের খেলার জায়গা - কৃত্রিমভাবে শেয়ারের ভ্যালুয়েশন ফাঁপিয়ে দেখিয়ে ঋণ ও বিনিয়োগ জোগাড় করা এবং অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সোনার ডিম প্রসবকারী জলপথ বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, খাদ্যপণ্য, গ্ৰীণ এনার্জী, খনি এইরকম সমস্ত ক্ষেত্রে ম্যাজিকের মতন ছেয়ে যাওয়া - শুধু দেশে নয় বিদেশেও।
অথচ, শেয়ার বাজারে কান পাতুন, শুনতে পাবেন - এইবেলা আদানিদের শেয়ার কিনে নাও, পরে লাভ পাবে গোছের ফিসফাস। কেন এমন হচ্ছে? প্যানিক সেল কোথায়?
খাতায় কলমে ১৯৯১ সাল থেকে আমাদের দেশে নয়া অর্থনীতির দৌড় শুরু। এর দশ বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ভারতীয় শেয়ার বাজারে ক্রমশঃ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভিড় বাড়তেই থাকে। ২০০০ সালের পর থেকে শেয়ারের 'ম্যাজিক রিটার্ন' শহুরে মধ্যবিত্ত অংশকে নেশা ধরিয়ে দেয়। সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের উদ্বৃত্ত অর্থ বেশি বেশি করে শেয়ারবাজারমুখী হতে শুরু করে। শহর থেকে শহরতলি; শহরতলি থেকে গ্ৰামে চাড়িয়ে যায় এই নেশা। ঝুঁকি নাও, মাল কামাও - এটাই মন্ত্র। মাঝেমধ্যে 'ঝাড়' খেলেও 'দম' থাকলে বড় দাঁও তোমার জন্য নিশ্চিত। ম্যাজিক রিটার্নের স্বাদ আম মানুষের মানসিকতা দিল ঘেঁটে। বাংলায় 'রোজভ্যালি', 'সারদা'র মতন পনজি ফান্ডগুলির রমরমা এই মানসিকতারই প্রতিফলন মাত্র। সরকার কেবল স্বল্পসঞ্চয়ে সুদ কমিয়ে এতে হাওয়া যুগিয়েছিল মাত্র। বাংলার মানুষের যে পরিমাণে টাকা সারদায় হাওয়া হয়ে গেছিল তাতে আগুন জ্বলে যাবার কথা ছিল বলে অনেকেই মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এই পনজি স্কীমগুলির পৃষ্ঠপোষক তৃণমূল দল রাজ্যে আরও জাঁকিয়ে বসে। এটাই সামাজিক দর্শনের পরিবর্তনের একটা প্রমাণ। রিস্ক বা ঝুঁকি নিজের নিজের। লাভ হলে বড় দাঁও। কামারের এক ঘা।
আদানীরা কিভাবে ব্যবসা করেন সেটা কোনো গোপন ব্যাপার ছিল না। আদানিদের সঙ্গে মোদি ভাইয়ের দোস্তির কেমিস্ট্রিও সবাই জানে। আমাদের দেশে 'স্ক্যাম ৯২' বা 'বিগ বুল'-এর মতন সিনেমা শেয়ারবাজারে আমজনতার উত্থানের আখ্যান দেখিয়ে হিট - যা আদতে হর্ষদ মেহতার শেয়ার স্ক্যামের ঘটনার উপর দাঁড়িয়ে। হর্ষদ মেহতারা এখন সমাজের অনেকের কাছেই হিরো - এটা বাস্তব। মোদিজী, আদানিরা 'ডেয়ারিং' - অতএব হিরো। টাকা বানাবার ব্যবস্থাটাতে আগে একচেটিয়া ঘাঘু রাঘব বোয়ালদের খেলাই চলতো, কিন্তু এখন খেলা ঘুরে গেছে - নয়া জামানার স্মার্ট এবং ডেয়ারিং যে কেউ এই খেলায় চালকের আসনে বসতেই পারে। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর একাংশ আদানিদের 'শর্ট লিস্ট' করলেও অনেকেই, যেন কিছুই হয়নি ভাবটাও খোলাখুলিই জানাতে কসুর করছেন না। অনেক বিদেশি সংস্থা এবং রাষ্ট্রও প্রকাশ্য সমর্থন জানাচ্ছে মোদি, আদানিদের প্রতি। এর থেকে বোঝা যায় এই খেলায় খেলোয়াড় অনেকেই এবং এটাই খেলার রীতি। ন্যায়-নীতির প্রশ্নটা গৌণ।
এটা সমাজের অসুখও বটে। ভয়ানক অসুখ। যে অসুখের কারনে করোনা মহামারীর দুই বছরে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির ছবি সব দেশে দেখা গেলেও প্রায় সব দেশেই এর মধ্যেও কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠির সম্পদ দুইগুণ তিনগুণ হয়ে যেতে দেখা যায় আশ্চর্যজনকভাবে। আর আমজনতার রুজি-রোজগারের অবস্থা একেবারে ঘেঁটে চচ্চড়ি! আয়ের ঠিক নেই, লেখাপড়ার ঠিক নেই, দাম আকাশছোঁয়া - এখন তো আইটির ছেলে-মেয়েরাও হঠাৎ করে কাজ হারিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা। কিন্তু, হিন্দু-মুসলমান, চীন-পাকিস্তান নিয়ে হাতের গুলি ফোলাবার কোনো ক্লান্তি নেই!
অনেক খারাপের মধ্যে একটা বোধহয় ভালো দিক এটাই যে পাবলিক খেলাটা বুঝে নিচ্ছে। যদিও ছাগলের তিন নম্বরের মতন অন্যের খেলায় বাজি লাগিয়ে তিড়িং বিড়িং লাফিয়ে ঘেমে নেয়ে যাবার দৃশ্যটা যতটা না হাসির তার থেকে অনেক বেশি করুণ। কারন আত্মবিস্মৃত জনতা নিছক ভেড়ার দল ছাড়া কিছু নয়। কষাইরা ছুরিতে ধার দিচ্ছে।